বৃহস্পতিবার, ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ০৩:২৮ অপরাহ্ন
আব্দুল্লাহ আল তৌহিদ
নোবিপ্রবি প্রতিনিধি
ক্লাস কিংবা পরীক্ষা নেয়ার ধকল, একাডেমিক বা প্রশাসনিক ভবনের এক ফ্লোর থেকে আরেক ফ্লোরে দৌড়াদৌড়ি, ডরমেটরি কিংবা বাসা থেকে ক্যাম্পাসে ছুটোছুটি, দিনের শেষে প্রশাসনিক কাজে বুদ হয়ে থাকা, অতঃপর শেষ রাতে সেমিস্টার বা সিটি পরীক্ষার খাতা দেখা কিংবা পরবর্তী দিনের কাজের পরিকল্পনা। এভাবেই বছর কাটে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) শিক্ষকদের। দিনের শেষ লগ্নে কলিগদের সাথে চায়ের আড্ডা কিংবা পরিবারের সদস্যের সাথে বসে একটু আড্ডা দেয়ার জন্য মন চাইলেও হয়তো হয়ে ওঠে না সবসময়। এতো হাসফাসের ভিড়ে ছুটে চলা মন প্রহর গোনে কবে ফিরে যাওয়া হবে ক্ষণিকের জন্য নিজের বেড়ে ওঠা নীড়ে।
এক সময় অপেক্ষার পালা শেষ হয়, বছর ঘুরে চলে আসে আরেকটা ঈদ। সময় আসে ব্যস্ততার রুটিন ফেলে কিছু অলস দুপুর কাটানোর, সঙ্গে প্রিয় মানুষগুলোর সঙ্গ। সে আশাতেই আমরা টিকিটের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াই, বিস্তর ধাক্কাধাক্কি হয়। হৃৎপিণ্ড ছলকে ওঠে। যাচ্ছি তাহলে এবার?
তবু আমরা যেতে চাই বাড়ি। একটু বিরতি পেলেই ছুটে যেতে চাই। ক্লান্তক্লিষ্ট শরীরে এলিয়ে পরতে চাই নিজের পুরনো ঘরে, পুরনো বালিশ আর বিছানায়, পুরনো ঘ্রাণের ভেতর। কিছু কল্পনা আর কিছু আধো-অন্ধকার বাস্তবতার ভেতর। মাত্র কয়েকটা দিনের জন্য হলেও মনে হয় শ্বাস নিচ্ছি, মনে হয় বেঁচে আছি, কী বিস্ময়, আজও বেঁচে আছি!
এবারের ঈদ নিয়ে কি ভাবছেন নোবিপ্রবির ফার্মেসী বিভাগের অধ্যাপক ড মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম:
১. আপনার কাছে ঈদ মানে কী?
আমার কাছে ঈদ মানে আনন্দ, একতা, ভালোবাসা ও ত্যাগের চেতনায় পরিপূর্ণ একটি পবিত্র উৎসব। ছোটবেলায় ঈদ মানেই ছিল নতুন জামা, সেমাই, এবং বন্ধুদের সাথে খেলাধুলা। এখন বয়স বাড়ার সাথে সাথে ঈদের মানে কিছুটা বদলেছে—এখন আমি চেষ্টা করি আমার পরিবার, বিশেষ করে আমার স্ত্রী ও চার কন্যার জন্য ঈদটা সুন্দরভাবে উপভোগ্য করে তুলতে।
২. আপনি কি মনে করেন যে, বর্তমান প্রজন্ম আগের মতো ঈদ উদযাপন করে?
খুবই সুন্দর প্রশ্ন, বর্তমান প্রজন্ম আগের মতো ঈদ উদযাপন করে না বলেই মনে হয়। প্রযুক্তি ও সামাজিক মাধ্যমের প্রভাবে তারা অনেকটাই ভার্চুয়াল জগতে ঢুকে পড়েছে। আগের মতো প্রতিবেশীদের বাড়িতে যাওয়া, একসাথে ঈদের নামাজ পড়া, বা খোলা মাঠে খেলাধুলার সেই রঙিন দিনগুলো এখন অনেকটাই ম্লান।
৩. ছোটবেলার বিশেষ কোন ঈদ স্মৃতি
আমার ছোটবেলাটা কেটেছে গ্রামে। ঈদের আগের দিনগুলোতেও ছিল এক ভিন্ন রকম উত্তেজনা। একবার ঈদের আগের দিনে আমরা ভাইয়েরা মিলে নৌকায় করে গ্রামের বাজারে গিয়েছিলাম। বাজারে পৌঁছে ভাইয়েরা আমাকে নৌকায় রেখে গিয়েছিল। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর যখন ওদের ফিরতে দেরি দেখে ভয় পেয়ে যাই, তখন আমি ছোট্ট শিশু মন নিয়ে একাই নৌকা চালিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হই। বয়স কম ছিল বলে ভালভাবে নৌকা চালাতে পারতাম না, তবুও কোনরকমে বৈঠা দিয়ে চালানোর চেষ্টা করছিলাম। পরে আমার ভাইয়েরা নির্ধারিত স্থানে এসে আমাকে না পেয়ে খুব চিন্তায় পড়ে যায় এবং শেষে অন্য একটি নৌকা নিয়ে আমাকে খুঁজে পেয়ে উদ্ধার করে। ঘটনাটা যদিও ঈদের আগের দিনের, তবে ঈদ এলেই সেই ভয়, সাহস আর ভালোবাসায় ভরা মুহূর্তগুলো আজও মনে পড়ে।
৪. আগে ছিলেন সন্তান, এখন বাবা হিসেবে ঈদ কেমন কাটে?
আগে ঈদে নিজের জন্য আনন্দ খুঁজতাম, এখন সন্তানের চোখে আনন্দ দেখাটাই সবচেয়ে বড় পাওয়া। বাবা হিসেবে ঈদ অনেক বেশি দায়িত্বশীলতা আর ভালোবাসার। এখন আমি চেষ্টা করি যেন আমার মেয়েরা ঈদের দিনটা উপভোগ করতে পারে—নতুন জামা, পছন্দের খাবার, আর সুন্দর মুহূর্তে ভরা দিন। ওদের হাসিমাখা মুখ দেখলে মনে হয়, আমার ছোটবেলা ফিরে পেয়েছি ওদের মাঝে। ওদের জন্য ভালো কিছু করতে পারা, ওদের সুখে সামান্য হলেও অবদান রাখতে পারা, আমার কাছে ঈদের সবচেয়ে পবিত্র অনুভূতি।
৫. বর্তমান প্রযুক্তি ঈদে কেমন প্রভাব ফেলছে? আপনি কি মনে করেন, প্রযুক্তির কারণে ঈদের আনন্দ বদলেছে?
প্রযুক্তি ঈদে যেমন কিছু সুবিধা এনেছে—দূরের আত্মীয়দের সাথে সংযোগ রক্ষা, ছবি বা ভিডিও শেয়ার করা—তেমনি পারিবারিক ও সামাজিক সংযোগ কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে। আগের মতো সবাই একসাথে বসে গল্প করা বা একত্রে সময় কাটানোর দৃশ্য এখন আর তেমন দেখা যায় না। আগে ঈদের দিনে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সালাম দেয়া, হাত ধরে কুশল বিনিময়, মুরুব্বিদের দোয়া নেয়া—এসবের মধ্যে যে আন্তরিকতা ছিল, তা এখন অনেকটাই মোবাইল স্ক্রিন আর ভার্চুয়াল শুভেচ্ছা বার্তায় সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। ঈদের দিনে বাসায় বসেই ঘন্টার পর ঘন্টা ফোনে সময় কাটানোর প্রবণতা অনেকটা ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সম্পর্কের উষ্ণতা হ্রাস করছে। প্রযুক্তিকে যদি আমরা ভারসাম্যের সাথে ব্যবহার করি, তাহলে সেটি ঈদের আনন্দে বাড়তি মাত্রা যোগ করতে পারে, নতুবা আসল আনন্দের জায়গাটুকুই হারিয়ে যায়।
৬. আপনার ঈদের কোন ঘটনার কথা এখনো সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে
আমার সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে একবার গ্রামের বাড়িতে কাটানো ঈদের কথা। তখন আমি ছোট, আর ঈদের দিন ছিল সত্যিই রঙিন ও প্রাণচঞ্চল। সকালবেলা ঈদের নামাজ শেষে আমরা একসাথে সবাই মাঠে খেলতে গিয়েছিলাম—লাঠি খেলা, দড়ি লাফ, আর পানিতে ঝাঁপাঝাঁপি—পুরো গ্রাম যেন উৎসবে মাতোয়ারা। দুপুরে বাড়ির উঠোনে সবাই মিলে গোল হয়ে বসে একসাথে খাবার খাওয়া, বড়দের হাস্যরস, আর শিশুদের ছুটে বেড়ানো—এই মুহূর্তগুলো আজও চোখের সামনে ভাসে। কোনো মোবাইল ছিল না, ছিল কেবল মানুষে মানুষে হৃদয়ের সংযোগ। ঈদের সেই নির্মল আনন্দ আর গ্রামীণ সাদামাটা জীবনের রঙ এখনও আমার মনে সবচেয়ে গভীরভাবে গেঁথে আছে।
৭. ঈদে আপনার প্রিয় খাবার কি? ঈদের খাবারের মধ্যে কোনটা ছাড়া ঈদ অসম্পূর্ণ মনে হয়?
ঈদে আমার প্রিয় খাবার হলো গরুর ঝাল মাংস আর পরোটা। বিশেষ করে গরম ভাতে গরুর ঝাল মাংসের সেই ঘ্রাণ ও স্বাদ এখনো মন ছুঁয়ে যায়। তবে ঈদের সকালে সেমাই ছাড়া ঈদ অসম্পূর্ণ মনে হয়। মায়ের হাতে বানানো ঘন দুধ আর ঘি দিয়ে রান্না করা সেমাইয়ের স্বাদ আজও ভুলতে পারি না। ঈদের সকাল যেন সেই সেমাইয়ের সুগন্ধেই শুরু হতো।
৮. এই ঈদে শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ কোনো বার্তা দিতে চান
এই ঈদে শিক্ষার্থীদের প্রতি আমার বার্তা—ঈদ শুধু আনন্দ নয়, এটি আত্মশ
All rights reserved © 2020-2024 dainikparibarton.com
অনুমতি ব্যতিত এই সাইটের কোনো কিছু কপি করা কপিরাইট আইনে দণ্ডনীয়।